সারাদেশে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ইস্যুতে বিএনপিতে লাঠালাঠি

গত ১ বছরে ৪৮৬টি অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষ, নিহত ৮২, আহত ৪,৭১৬। নিষিদ্ধ আ.লীগ কর্মীকে আশ্রয় দেওয়া নিয়ে রক্তক্ষয়, সারাদেশে ছড়াচ্ছে কোন্দলের ছায়া।

টুইট প্রতিবেদক: ২০২৫ সালের মে মাসে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণার পর থেকে তাদের সাবেক নেতা-কর্মীদের বিএনপিতে যোগদান বা আশ্রয় দেওয়া নিয়ে দেশজুড়ে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল চরম আকার ধারণ করেছে। এই কোন্দল থেকে লাঠালাঠি, সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও রক্তপাতের ঘটনা ব্যাপকভাবে বেড়েছে।

মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি-এর ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই বছরে সারাদেশে মোট ৯১৪টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ৪৮৬টি ঘটনা (৫৩ শতাংশ) ছিল বিএনপি ও তার সহযোগী সংগঠনের অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষ।

এসব সংঘর্ষে অন্তত ৮২ জন নিহত হয়েছেন, যা মোট রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহতের ৬২ শতাংশ। একই সময়ে ৪,৭১৬ জন আহত হয়েছেন, যা মোট আহতের ৬৩ শতাংশ।

রাজশাহীর দুর্গাপুরের সাম্প্রতিক সংঘর্ষ

এর সর্বশেষ উদাহরণ দেখা যায় রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলায়। সোমবার (১২ জানুয়ারি ২০২৬) নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কর্মীদের বিএনপিতে আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে বিএনপির দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে রেজাউল ইসলাম, তার ছেলে ইমন এবং শাহেদ আলী আহত হন। এই ঘটনা ২০২৫ সালের ধারাবাহিক কোন্দলেরই অংশ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ কর্মীদের যোগদান বা আশ্রয় ইস্যুতে গত এক বছরে দেশজুড়ে বেশ কয়েকটি বড় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।

কুড়িগ্রাম (ডিসেম্বর ২০২৫): আওয়ামী লীগের ৯ জন নেতা-কর্মী বিএনপিতে যোগ দিলে তীব্র অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা লোকমান হোসেন লিমন একে “শহীদদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা” বলে মন্তব্য করেন।

ফরিদপুর (নভেম্বর–ডিসেম্বর ২০২৫): শতাধিক আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীর যোগদানকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের সংঘর্ষে অর্ধশতাধিক আহত হন এবং অন্তত ২০টি বাড়ি ভাঙচুর হয়।

গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া (ডিসেম্বর ২০২৫): ১৭ জন সাবেক আওয়ামী লীগ কর্মীর বিএনপিতে যোগদানের পর দলীয় কোন্দল চরমে পৌঁছায়।

রংপুর ও খুলনা বিভাগ (ডিসেম্বর ২০২৫–জানুয়ারি ২০২৬): মিটিংয়ে হাতাহাতি, ২ থেকে ৪ জন আহত। খুলনায় ‘ফ্যাসিস্ট’ আখ্যা দিয়ে বয়কটের দাবি ওঠে।

সিলেট বিভাগ (ডিসেম্বর ২০২৫): অনুরূপ ইস্যুতে সংঘর্ষে ৪ জন আহত হন।

চট্টগ্রাম ও কুমিল্লা (ফেব্রুয়ারি–মার্চ ২০২৫): কমিটি গঠন ও দলবদলকে কেন্দ্র করে ফ্যাকশনাল সংঘর্ষে ১৬ জন নিহত হন।

কেন বাড়ছে এই সংঘর্ষ?

বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হওয়ার পর প্রায় ১ কোটি কর্মী-সমর্থক রাজনৈতিক আশ্রয়ের সন্ধানে রয়েছেন। বিএনপি কেন্দ্রীয়ভাবে কঠোর স্ক্রিনিং প্রক্রিয়া চালুর ঘোষণা দিলেও স্থানীয় পর্যায়ে তা কার্যকর হচ্ছে না।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্পষ্ট করে বলেছেন, “ফ্যাসিস্ট কর্মকাণ্ডে জড়িতদের দলে নেওয়া হবে না।” তবে বাস্তবে অনেক এলাকায় সাবেক আওয়ামী লীগ নেতাদের যোগদানকে কেন্দ্র করে দ্বন্দ্ব তৈরি হচ্ছে।

রাজনৈতিক প্রভাব

এইচআরএসএস-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিএনপির অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষে নিহতদের ৭০ শতাংশই বিএনপি কর্মী। একই বছরে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে সরাসরি সংঘর্ষ হয়েছে ১৫২টি, যেখানে নিহত হয়েছেন ১৯ জন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই অভ্যন্তরীণ কোন্দল আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন (ফেব্রুয়ারি ২০২৬) সামনে রেখে বিএনপির সাংগঠনিক ঐক্য ও জনসমর্থনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

সূত্র: এইচআরএসএস ২০২৫ রিপোর্ট, প্রথম আলো, দ্য ডেইলি স্টার, আল জাজিরা, দ্য ডিপ্লোম্যাট, চ্যানেল ২৪