ইরান-সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ২৫% শুল্ক আরোপ

ইরানকে চাপে রাখতে ট্রাম্পের ট্যারিফ বোমা: ‘তাৎক্ষণিক কার্যকর’ ঘোষণা, বিশ্ব বাণিজ্যে নতুন চাপ। চীন-ভারতসহ বাণিজ্য অংশীদারদের বড় প্রভাবের আশঙ্কা।
বিশ্ব ডেস্ক: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করা দেশগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যে ২৫ শতাংশ ট্যারিফ আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, এই সিদ্ধান্ত “তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর” হবে। ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে নেওয়া এই পদক্ষেপ তেহরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়াতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এমনিতেই ইরান মুদ্রা অবমূল্যায়ন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে গভীর অর্থনৈতিক সংকটে রয়েছে।
ট্রাম্পের ঘোষণার
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার নিজস্ব সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যালে এক পোস্টে লেখেন, “তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করা যেকোনো দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের সব ধরনের বাণিজ্যে ২৫ শতাংশ ট্যারিফ প্রদান করবে। এই আদেশ চূড়ান্ত এবং কার্যকর।”
১২ জানুয়ারি দেওয়া এই ঘোষণার মাধ্যমে মূলত ইরানের প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার দেশগুলোকেই লক্ষ্য করা হয়েছে। এসব দেশের মধ্যে চীন শীর্ষে, পাশাপাশি ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), তুরস্ক ও ভারতও রয়েছে। তবে ‘ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করা’ বলতে ঠিক কী বোঝানো হচ্ছে—কোন খাত, কোন লেনদেন বা কোন সময়সীমা এর আওতায় পড়বে—সে বিষয়ে হোয়াইট হাউস এখনো কোনো স্পষ্ট নির্দেশনা দেয়নি।
ট্রাম্পের অফিসিয়াল ট্রুথ সোশ্যাল পোস্ট (Donald J. Trump @realDonaldTrump): “Effective immediately, any Country doing business with the Islamic Republic of Iran will pay a Tariff of 25% on any and all business being done with the United States of America. This Order is final and conclusive.” (১২ জানুয়ারি ২০২৬)।
সামরিক বিকল্পের ইঙ্গিত
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ক্যারোলিন লেভিট জানিয়েছেন, ইরান পরিস্থিতিতে বিমান হামলাসহ সামরিক বিকল্পগুলো এখনও “টেবিলে রয়েছে”, বিশেষ করে যদি ইরানে বিক্ষোভকারীদের ওপর আরও কঠোর দমনমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এর আগে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, ইরানি কর্মকর্তারা তার সঙ্গে আলোচনার জন্য যোগাযোগ করেছেন। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, বৈঠকের আগেই যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারে।
ইরানের বিক্ষোভ
ইরানে চলমান বিক্ষোভের সূচনা হয় গত বছরের শেষ দিকে, মূলত জাতীয় মুদ্রা রিয়ালের ব্যাপক দরপতনকে কেন্দ্র করে। পরে এই আন্দোলন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির বৈধতা নিয়ে এক বড় রাজনৈতিক সংকটে রূপ নেয়।
মার্কিনভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্ট নিউজ এজেন্সি (HRANA) জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত প্রায় ৫০০ জন বিক্ষোভকারী এবং ৪৮ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে, যদিও প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ ছাড়া হাজার হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
ইন্টারনেট সংযোগ ব্যাপকভাবে বন্ধ থাকায় নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ কঠিন হয়ে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম, যেমন বিবিসি, ইরান থেকে সরাসরি রিপোর্টিং করতে পারছে না।
ইরানের অর্থনৈতিক সংকট
ইরানের অর্থনীতি ইতোমধ্যে দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে আরোপিত আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞায় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। গত এক বছরে রিয়ালের মান নেমে গেছে রেকর্ড সর্বনিম্ন পর্যায়ে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি ৪০ শতাংশেরও বেশি বেড়ে যাওয়ায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের ঘোষিত এই ট্যারিফ চীনের মতো দেশগুলোকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করতে পারে, কারণ চীনই ইরানের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার।
ভারতের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের প্রভাবের আশঙ্কা রয়েছে। বর্তমানে ভারতের সঙ্গে ইরানের প্রায় ১.৭ বিলিয়ন ডলারের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য রয়েছে। এই নতুন সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে টেক্সটাইল, ফার্মাসিউটিক্যালস ও কেমিক্যালস খাতে রপ্তানির ওপর অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ ট্যারিফ যোগ হতে পারে, ফলে মোট ট্যারিফের হার ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। একই সঙ্গে ভারতের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ চাবাহার বন্দর প্রকল্পও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
এদিকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি যুক্তরাষ্ট্রকে ‘প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড’ বন্ধ করার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই পদক্ষেপ বিশ্ব বাণিজ্যে নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি করবে, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার দেশগুলোর জন্য।
হোয়াইট হাউস থেকে বিস্তারিত নির্দেশনা না আসা পর্যন্ত কোন কোন পণ্য বা কোন দেশ সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হবে—তা এখনও স্পষ্ট নয়।
ট্রাম্পের এই ঘোষণা এমন এক সময়ে এসেছে, যখন ইরান ইতোমধ্যে গভীর অভ্যন্তরীণ সংকট, অর্থনৈতিক দুরবস্থা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে রয়েছে।
সর্বশেষ তথ্যমতে, ইরানে চলমান বিক্ষোভ ১৪তম দিনে পৌঁছেছে, আর ট্রাম্পের নেওয়া এই সিদ্ধান্ত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
সূত্র: Al Jazeera, The Washington Post, Fox News, CNBC, USA Today






