টানা বিক্ষোভে ইরান রণক্ষেত্র: কোন পথে যাচ্ছে ইরান?

অর্থনৈতিক সংকট থেকে রাজনৈতিক বিদ্রোহ: ইরানে টানা ১৫ দিনের বিক্ষোভে অচলাবস্থা।
টুইট ডেস্ক: ইরানে চলমান জাতীয় বিক্ষোভ টানা ১৫ দিনে গড়িয়ে দেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ ও অস্থির অধ্যায় তৈরি করেছে। শুরুতে তীব্র অর্থনৈতিক সংকট, লাগামহীন মূল্যস্ফীতি এবং মুদ্রার অবমূল্যায়নের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা এই আন্দোলন এখন সরাসরি সরকার ও শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনের দাবিতে রূপ নিয়েছে।
কঠোর দমন-পীড়ন, ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট এবং ব্যাপক গ্রেপ্তারের মধ্যেও দেশজুড়ে প্রতিবাদ অব্যাহত রয়েছে।
অর্থনৈতিক বিপর্যয় থেকেই বিস্ফোরণ
বিশ্লেষকদের মতে, এই বিক্ষোভের মূল চালিকাশক্তি অর্থনীতি। ২০২৫ সালের শেষ দিকে ইরানি মুদ্রা রিয়াল মার্কিন ডলারের বিপরীতে ঐতিহাসিক নিম্নস্তরে নেমে আসে—প্রতি ডলারে প্রায় ১৩ লাখ ৪০ হাজার রিয়াল। একই সময়ে মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়ায় ৪০ থেকে ৪২ শতাংশে। খাদ্যপণ্য, জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়।
ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারে ব্যবসায়ীদের ধর্মঘটের মাধ্যমে আন্দোলনের সূচনা হয়। দ্রুতই তা ছড়িয়ে পড়ে দেশের বিভিন্ন শহরে। অর্থনৈতিক দাবির পাশাপাশি রাস্তায় শোনা যেতে থাকে সরাসরি সরকারবিরোধী ও শাসন পরিবর্তনের স্লোগান।
দেশজুড়ে বিস্তার, সংঘর্ষ ও দমন
বর্তমানে এই বিক্ষোভ ইরানের ১০০টিরও বেশি শহর ও সব প্রদেশে ছড়িয়ে পড়েছে। তেহরান, ইসফাহান, কুর্দিস্তান, খুজেস্তান, ইলাম ও মারভদাশতসহ বিভিন্ন এলাকায় সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। কিছু স্থানে সরকারি ভবন, পুলিশ স্টেশন, আইআরজিসি ও বাসিজের স্থাপনায় অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে।
জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে পরিস্থিতি আরও সহিংস রূপ নেয়। নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে বহু মানুষ নিহত ও আহত হন। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা ৫৪৪ ছাড়িয়েছে, যদিও সরকারিভাবে কম সংখ্যার কথা বলা হচ্ছে। হাজারো মানুষ আহত এবং কয়েক হাজার বিক্ষোভকারী গ্রেপ্তার হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
সরকারের কঠোর অবস্থান
ইরান সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আইআরজিসি ও বাসিজ বাহিনী মোতায়েন করেছে। লাইভ অ্যামুনিশন, টিয়ার গ্যাস ও জলকামান ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। একাধিকবার ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, যাতে তথ্য আদান-প্রদান ও আন্দোলনের সমন্বয় ব্যাহত হয়।
প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান অর্থনৈতিক সংকটের কথা স্বীকার করলেও বিক্ষোভকারীদের ‘দেশবিরোধী শক্তি’ ও ‘সন্ত্রাসী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে। সরকার ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটে বেতন বৃদ্ধি ও ভর্তুকির ঘোষণা দিলেও আন্দোলনকারীরা তা প্রত্যাখ্যান করেছেন।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া বাড়ছে
ইরানের পরিস্থিতি ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উদ্বেগ বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েলসহ কয়েকটি দেশ বিক্ষোভকারীদের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করেছে। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সহিংসতা বন্ধ ও সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছেন। মানবাধিকার সংগঠনগুলো নিরাপত্তা বাহিনীর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের তীব্র সমালোচনা করেছে।
অন্যদিকে, ইরান সরকার বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগ তুলে পাল্টা হুমকিও দিয়েছে, যা মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।
কোন পথে যাচ্ছে ইরান?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই আন্দোলন আগের যেকোনো বিক্ষোভের তুলনায় ভিন্ন, কারণ এর ভিত্তি গভীর অর্থনৈতিক সংকটে প্রোথিত। সরকার শক্ত হাতে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারলেও দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান না হলে অস্থিরতা কাটবে না। সেনাবাহিনী বা নিরাপত্তা কাঠামোর ভেতরে ফাটল ধরলে পরিস্থিতি আরও নাটকীয় মোড় নিতে পারে।
ইরানে চলমান এই বিক্ষোভ শুধু একটি অর্থনৈতিক আন্দোলন নয়, বরং এটি ধীরে ধীরে রাজনৈতিক বিদ্রোহের রূপ নিচ্ছে। প্রাণহানি ও দমন-পীড়নের মধ্যেও বিক্ষোভকারীদের অটল অবস্থান দেশটির ভবিষ্যৎ রাজনীতিকে গভীর অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তনশীল—ইরান কোন পথে যাবে, তা নির্ধারণ হবে আগামী দিনগুলোতেই।






