ক্রেডিট কার্ড সুদের ওপর ১০ শতাংশ সীমা প্রস্তাব ট্রাম্পের

শিল্পখাতের তীব্র বিরোধিতা, ভোক্তাদের জন্য বছরে ১০০ বিলিয়ন ডলার সাশ্রয়ের সম্ভাবনা।
বিশ্ব ডেস্ক: নিজের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পুনরুজ্জীবিত করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্রেডিট কার্ডের সুদের হার এক বছরের জন্য সর্বোচ্চ ১০ শতাংশে সীমিত করার প্রস্তাব দিয়েছেন। এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে মার্কিন ভোক্তারা বছরে প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার সুদ সাশ্রয় করতে পারবেন বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
তবে প্রস্তাবটি আর্থিক খাত, বিশেষ করে ব্যাংক ও ক্রেডিট কার্ড কোম্পানিগুলোর তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়েছে।
শুক্রবার (১০ জানুয়ারি) রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যাল–এ দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প লেখেন,
“আমরা আর আমেরিকান জনগণকে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ সুদ আদায়কারী ক্রেডিট কার্ড কোম্পানির হাতে ঠকতে দেব না।”
তবে এই সুদসীমা আইন প্রণয়ন না নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে কার্যকর করা হবে—সে বিষয়ে স্পষ্ট করেননি ট্রাম্প। যদিও রিপাবলিকান সিনেটর রজার মার্শাল জানিয়েছেন, তিনি প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং তার পূর্ণ সমর্থনে একটি বিল উত্থাপনে কাজ করবেন। ট্রাম্প আশা প্রকাশ করেছেন, আগামী ২০ জানুয়ারি—তার দ্বিতীয় মেয়াদের এক বছর পূর্তির দিন থেকেই এই সীমা কার্যকর হবে।
শিল্পখাতের বিরোধিতা
ওয়াল স্ট্রিট ও ক্রেডিট কার্ড কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে প্রবল বিরোধিতার আভাস পাওয়া গেছে। ২০২৪ সালের নির্বাচনে এসব প্রতিষ্ঠান ট্রাম্পের প্রচারণায় বড় অঙ্কের অনুদান দিয়েছিল এবং তার দ্বিতীয় মেয়াদের অর্থনৈতিক এজেন্ডাকে সমর্থনও করেছে।
ব্যাংকগুলোর দাবি, সুদের ওপর কড়াকড়ি আরোপ করলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে স্বল্প আয়ের ও ঝুঁকিপূর্ণ গ্রাহকরা। তাদের মতে, ব্যাংকগুলো তখন উচ্চ ঝুঁকির গ্রাহকদের ঋণ দেওয়া কমিয়ে দেবে বা বন্ধ করবে, ফলে এসব মানুষ বাধ্য হয়ে পে-ডে লোন বা বন্ধকী দোকানের মতো উচ্চসুদ বিকল্পে ঝুঁকবে।
আমেরিকান ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন এক যৌথ বিবৃতিতে বলেছে,
“এই সীমা কার্যকর হলে ভোক্তারা কম নিয়ন্ত্রিত ও আরও ব্যয়বহুল আর্থিক পণ্যের দিকে ঠেলে দেওয়া হবে।”
বর্তমান চিত্র
ভোক্তা সুরক্ষা ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ১৯ কোটি ৫০ লাখ মানুষ ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করেছেন এবং তারা মোট ১৬০ বিলিয়ন ডলার সুদ পরিশোধ করেছেন। নিউ ইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভের হিসাবে, গত বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে মার্কিন ক্রেডিট কার্ড ঋণ দাঁড়িয়েছে ১.২৩ ট্রিলিয়ন ডলারে, যা ইতিহাসের সর্বোচ্চ।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে ক্রেডিট কার্ডের গড় সুদের হার ১৯.৬৫ থেকে ২১.৫ শতাংশ—যা ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে তথ্য সংগ্রহ শুরু হওয়ার পর প্রায় সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। এক দশক আগে এই হার ছিল গড়ে ১২ শতাংশ।
গবেষকরা বলছেন, সুদের হার ১০ শতাংশে নামালে ব্যাংক খাত বড় ধাক্কা খেলেও তারা লোকসানে পড়বে না। তবে ক্রেডিট কার্ড রিওয়ার্ড, ক্যাশব্যাক ও অন্যান্য সুবিধা কমে যেতে পারে।
ভ্যান্ডারবিল্ট পলিসি অ্যাক্সেলারেটরের গবেষক ব্রায়ান শিয়ারার বলেন,
“১০ শতাংশ সুদসীমা আরোপ করলে বছরে ১০০ বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় হবে, এবং ব্যাংকগুলো যেভাবে ব্যাপক অ্যাকাউন্ট বন্ধের কথা বলছে—তা ঘটবে না। কারণ বড় ব্যাংকগুলো সব আয়ের স্তরের গ্রাহকদের কাছ থেকেই বিপুল মুনাফা করছে।”
তবে ইতিহাস বলছে, সুদসীমা কখনো কখনো কম ক্রেডিট স্কোরধারীদের বাজারের বাইরে ঠেলে দেয়। উদাহরণ হিসেবে আরকানসাস অঙ্গরাজ্যের কথা উল্লেখ করা হয়, যেখানে ১৭ শতাংশ সুদসীমার কারণে স্বল্প আয়ের মানুষ ভোক্তা ঋণ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। গবেষণায় আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে, ১০ শতাংশ সীমা কার্যকর হলে ৬০০-এর নিচে ক্রেডিট স্কোরধারীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।
রাজনৈতিক সমর্থন ও সমালোচনা
ইতোমধ্যে এই উদ্যোগ কংগ্রেসে দ্বিদলীয় সমর্থন পাচ্ছে। সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স ও জশ হাওলি পাঁচ বছরের জন্য ১০ শতাংশ সুদসীমার প্রস্তাব দিয়েছেন। প্রতিনিধি পরিষদে আলেক্সান্দ্রিয়া ওকাসিও-কোর্তেজ ও আনা পলিনা লুনা একই ধরনের বিল উত্থাপন করেছেন।
তবে স্যান্ডার্স অভিযোগ করেছেন, একদিকে ট্রাম্প সুদসীমার কথা বললেও অন্যদিকে বড় ব্যাংকগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ শিথিল করেছেন, যা তাদের বেশি ফি আদায়ের সুযোগ দিয়েছে।
হোয়াইট হাউস এখনো স্পষ্ট করেনি, কীভাবে এই সুদসীমা কার্যকর করা হবে বা এ বিষয়ে ক্রেডিট কার্ড কোম্পানিগুলোর সঙ্গে আলোচনা হয়েছে কি না।
বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে তা যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তা ঋণ বাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন আনবে—একদিকে স্বস্তি দেবে কোটি কোটি গ্রাহককে, অন্যদিকে ব্যাংক খাতকে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি করবে।






