ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট ও গুলির মধ্যেও ৩১ প্রদেশে ছড়িয়ে পড়েছে আন্দোলন

ইরানে চলমান বিপ্লব: প্রতিবাদকারীদের ‘আল্লাহর শত্রু’ ঘোষণা।
মৃত্যুদণ্ডের হুমকি সত্ত্বেও রাস্তায় অটল জনগণ, আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে প্রতিরোধ অব্যাহত।
বিশ্ব ডেস্ক: ইরানে প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে চলমান ব্যাপক সরকারবিরোধী আন্দোলনের ওপর দমনপীড়ন আরও কঠোর আকার ধারণ করেছে। দেশটির অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ মোভাহেদি আজাদ শনিবার (১০ জানুয়ারি) রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক বক্তব্যে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যারা প্রতিবাদে অংশ নেবে বা আন্দোলনকারীদের সহায়তা করবে, তাদের ‘মোহারেব’—অর্থাৎ আল্লাহ ও ইসলামের শত্রু হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
ইরানের ইসলামী দণ্ডবিধির ১৮৬ ও ১৯০ ধারার উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, ‘মোহারেব’ হিসেবে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড, ফাঁসি, ডান হাত ও বাম পা বিচ্ছিন্নকরণ কিংবা আজীবন নির্বাসনের মতো কঠোর শাস্তি দেওয়া হতে পারে। সরকারের এই ঘোষণা দেশজুড়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করলেও প্রতিবাদকারীরা বলছেন, “আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন, জুলুম করে এই আন্দোলন থামানো যাবে না।”
রক্তক্ষয়ী দমন ও তথ্য অন্ধকার
নিরাপত্তা বাহিনীর গুলি, গণগ্রেপ্তার ও নজিরবিহীন ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের মধ্যেও আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে ইরানের সব ৩১টি প্রদেশে। মার্কিনভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস অ্যাকটিভিস্টস নিউজ এজেন্সি (HRANA) জানিয়েছে, এ পর্যন্ত অন্তত ৬৫ জন নিহত এবং ২,৩০০-এর বেশি মানুষ গ্রেপ্তার হয়েছেন। কিছু নির্ভরযোগ্য সূত্র মৃতের সংখ্যা ১১৬ পর্যন্ত হতে পারে বলে দাবি করছে। গত ৪৮ ঘণ্টায় হাজার হাজার মানুষ আহত হয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
নেটওয়ার্ক পর্যবেক্ষণ সংস্থা NetBlocks জানিয়েছে, তেহরানে বৃহস্পতিবার থেকে ইন্টারনেট ও মোবাইল ফোন সেবা কার্যত বন্ধ রয়েছে, যা সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে ভয়াবহ যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার ঘটনা। মানবাধিকারকর্মীদের অভিযোগ, এতে নিরাপত্তা বাহিনীকে আন্তর্জাতিক নজরদারি ছাড়াই দমন অভিযান চালানোর সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।
আন্দোলনের কারণ ও রূপান্তর
এই আন্দোলনের সূচনা হয় ডিসেম্বর ২০২৫-এর শেষদিকে, যখন ইরানি মুদ্রা রিয়ালের ঐতিহাসিক পতন ঘটে—
১.৪ মিলিয়ন রিয়াল = ১ মার্কিন ডলার। এর সঙ্গে যুক্ত হয় ভয়াবহ মূল্যস্ফীতি (খাদ্যে প্রায় ৭২ শতাংশ), বেকারত্ব, বিদ্যুৎ ও পানির সংকট এবং দীর্ঘদিনের দুর্নীতির ক্ষোভ।
শুরুতে অর্থনৈতিক দাবিতে গড়ে ওঠা এই আন্দোলন দ্রুত রূপ নেয় ইসলামিক রিপাবলিকের পতনের দাবিতে। বিভিন্ন শহরে শোনা যাচ্ছে সুপ্রিম লিডার আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেইয়ের বিরুদ্ধে স্লোগান—
“Death to Khamenei”। একই সঙ্গে অনেক প্রতিবাদকারী নির্বাসিত ক্রাউন প্রিন্স রেজা পাহলভির প্রত্যাবর্তনের দাবি তুলছেন।
প্রতিবাদে ব্যবহৃত হচ্ছে ১৯৭৯ সালের আগের ঐতিহাসিক ‘লায়ন অ্যান্ড সান’ (সিংহ ও সূর্য) পতাকা, যা এখন ইসলামিক রিপাবলিকবিরোধী প্রতিরোধের প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
রেজা পাহলভির আহ্বান
নির্বাসিত ক্রাউন প্রিন্স রেজা পাহলভি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, শহরের কেন্দ্র দখল করে প্রতীকী পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তুলতে। তিনি শনিবার ও রোববার (১০–১১ জানুয়ারি) আরও বড় বিক্ষোভের ডাক দেন।
এরই মধ্যে তেহরান, মাশহাদ, ইসফাহানসহ বিভিন্ন শহরে রাস্তা অবরোধ, অগ্নিসংযোগ ও নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
ইরানের পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছেন, প্রতিবাদকারীদের বিরুদ্ধে আরও হত্যাকাণ্ড চালানো হলে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালানো হতে পারে। নিউ ইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, ট্রাম্পকে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন স্ট্রাইক অপশন উপস্থাপন করা হয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া যৌথ বিবৃতিতে ইরানি জনগণের সাহসের প্রশংসা করে দমন-পীড়নের নিন্দা জানিয়েছে।
বিশ্বজুড়ে ইরানি প্রবাসীরা লন্ডন, বার্লিন, প্যারিস, টরন্টোসহ বিভিন্ন শহরে সংহতি সমাবেশ করছেন। লন্ডনে এক নাটকীয় ঘটনায় এক প্রতিবাদকারী ইরান দূতাবাস থেকে বর্তমান পতাকা নামিয়ে লায়ন অ্যান্ড সান পতাকা উত্তোলন করেন, যা বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তোলে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই আন্দোলন ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর ইসলামিক রিপাবলিকের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় সঠিক তথ্য পাওয়া কঠিন হলেও প্রতিবাদকারীদের কণ্ঠে একই বার্তা—
“জুলুম চিরস্থায়ী নয়। আল্লাহ ন্যায়বিচার করেন। আমরা ভয় পাই না, ইনশাআল্লাহ বিজয় আমাদেরই হবে।”







