হিম বাতাসে কাঁপছে দেশ

সুঁইয়ের ফলার মতো বিধছে হিম বাতাস, কুয়াশার চাদরে ঢাকা পড়তে পারে দেশ।

টুইট প্রতি‌বেদক: টানা ঘন কুয়াশা ও হাড়কাঁপানো হিম বাতাসে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে দেশের জনজীবন। রাতভর কুয়াশা আর ভোরের তীব্র শীতে স্থবিরতা নেমে এসেছে সড়ক, নৌ ও আকাশপথে।

তাপমাত্রার পারদ ক্রমেই নামছে। গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে পাবনার ঈশ্বরদীতে ৮ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। রাজধানী ঢাকায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১৩ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সোমবার দেশের অন্তত ১৫টি জেলার ওপর দিয়ে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বয়ে গেছে, যা আরও বিস্তৃত ও দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা করছেন আবহাওয়াবিদরা।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস

আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ ড. মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক জানান, সোমবার রাত থেকেই তাপমাত্রা ধাপে ধাপে কমতে শুরু করেছে। চলতি জানুয়ারি মাসে ২ থেকে ৩টি শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যার মধ্যে অন্তত ১ থেকে ২টি তীব্র হতে পারে।

বর্তমান শৈত্যপ্রবাহ ও ঘন কুয়াশা আগামী ১২ জানুয়ারি পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে।

তিনি বলেন, আজ মঙ্গলবার রাত থেকে দেশের অধিকাংশ অঞ্চল ঘন কুয়াশার চাদরে ঢেকে যেতে পারে। বিশেষ করে রংপুর, রাজশাহী ও খুলনা বিভাগে তাপমাত্রা নেমে আসতে পারে ৫ থেকে ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে, যা তীব্র শৈত্যপ্রবাহের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

কুয়াশায় সূর্য আড়ালে

কানাডার সাসকাচুয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মোস্তফা কামাল পলাশ জানান, রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ ও ঢাকা বিভাগের অধিকাংশ জেলায় দুপুর ১২টার আগে সূর্যের দেখা মিলবে না। খুলনা ও বরিশাল বিভাগে সকাল ১০টার পর ধীরে ধীরে আলো দেখা যেতে পারে। কুয়াশার কারণে দিনের তাপমাত্রা বাড়ছে না, ফলে দিন-রাতের তাপমাত্রার পার্থক্য কমে শীতের অনুভূতি আরও তীব্র হচ্ছে।

যেসব জেলায় শৈত্যপ্রবাহ

আবহাওয়া অধিদপ্তর জানায়, টাঙ্গাইল, ফরিদপুর, আরিচা, নারায়ণগঞ্জ, গোপালগঞ্জ, রাজশাহী, ঈশ্বরদী, বগুড়া, বদলগাছি, তাড়াশ, বাঘাবাড়ি, দিনাজপুর, যশোর, চুয়াডাঙ্গা ও কুমারখালির ওপর দিয়ে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। মধ্যরাত থেকে সকাল পর্যন্ত নদী অববাহিকা এলাকায় মাঝারি থেকে ঘন কুয়াশা পড়তে পারে, যা কোথাও কোথাও দুপুর পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।

জনজীবনে চরম ভোগান্তি

শৈত্যপ্রবাহে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন দিনমজুর, নিম্নআয়ের মানুষ ও খোলা আকাশের নিচে বসবাসকারীরা। কনকনে শীতে অনেকেই সকালে কাজে বের হতে পারছেন না। উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় মানুষ আগুন জ্বালিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা করছেন।

শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে সর্দি-কাশি, শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়া ও ঠান্ডাজনিত রোগ বাড়ছে। হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপও বাড়ছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।

যোগাযোগে ব্যাঘাতের আশঙ্কা

ঘন কুয়াশার কারণে সড়ক ও নৌপথে যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। ভোরের দিকে মহাসড়কে যানবাহন চলাচল ধীরগতির হয়ে পড়েছে। কুয়াশা আরও ঘন হলে বিমান চলাচলেও বিঘ্ন ঘটতে পারে বলে সতর্ক করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

শৈত্যপ্রবাহ কী ও কেন হয়

শৈত্যপ্রবাহ হলো এমন একটি আবহাওয়া পরিস্থিতি, যখন তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গিয়ে কয়েক দিন স্থায়ী হয়। আবহাওয়া অধিদপ্তরের সংজ্ঞা অনুযায়ী—

মৃদু শৈত্যপ্রবাহ: ৮–১০° সেলসিয়াস
মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ: ৬–৮° সেলসিয়াস
তীব্র শৈত্যপ্রবাহ: ৬° সেলসিয়াসের নিচে

শৈত্যপ্রবাহের প্রধান কারণ হলো হিমালয় অঞ্চল থেকে উত্তর-পশ্চিম দিক দিয়ে ঠান্ডা ও শুষ্ক বাতাসের প্রবাহ, পশ্চিমা লঘুচাপের প্রভাব এবং ঘন কুয়াশা। কুয়াশার কারণে সূর্যের তাপ মাটিতে পৌঁছাতে না পারায় শীত আরও তীব্র হয়।

কৃষি ও স্বাস্থ্যঝুঁকি

শৈত্যপ্রবাহে বোরো ধানের চারা, সবজি ও আলুর ফলনে ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। কৃষকদের ফসল রক্ষায় বাড়তি সতর্কতা নিতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে শিশু ও বয়স্কদের উষ্ণ কাপড় ব্যবহার, ঠান্ডা এড়িয়ে চলা এবং প্রয়োজন ছাড়া বাইরে না বের হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

আবহাওয়াবিদদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ভবিষ্যতে শৈত্যপ্রবাহের তীব্রতা ও স্থায়িত্ব আরও বাড়তে পারে। তাই ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে প্রস্তুতি ও সচেতনতার বিকল্প নেই।