সুরভীর বয়স বিতর্কে তদন্ত কর্মকর্তাকে শোকজ

সুরভীর বয়স বিতর্কে আদালতের কড়া অবস্থান: তদন্ত কর্মকর্তাকে শোকজ।

টুইট প্রতি‌বেদক: ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে সক্রিয় ভূমিকার কারণে সামাজিক মাধ্যমে আলোচিত তাহরিমা জান্নাত সুরভী (সুরভী) নতুন করে বিতর্কের কেন্দ্রে। গাজীপুরে দায়ের করা একাধিক অভিযোগের মামলায় তার গ্রেপ্তার, রিমান্ড, জামিন এবং বিশেষ করে বয়স নিয়ে অসঙ্গতি দেশজুড়ে আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।

বয়সসংক্রান্ত বিভ্রান্তির দায়ে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তাকে কারণ দর্শানোর (শোকজ) নোটিশ দিয়েছেন গাজীপুরের জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট।

পরিচয় ও জুলাই অভ্যুত্থানে ভূমিকা

তাহরিমা জান্নাত সুরভী গাজীপুরের ভাওয়াল বদরে আলম সরকারি কলেজের ছাত্রী। ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও পরবর্তী গণঅভ্যুত্থানে তিনি সক্রিয় ছিলেন। লাইভ, ভিডিও ও পোস্টের মাধ্যমে সামাজিক মাধ্যমে তার পরিচিতি ছড়িয়ে পড়ে। সমর্থকদের একাংশ তাকে ‘জুলাই যোদ্ধা’ হিসেবে উল্লেখ করলেও কিছু গণমাধ্যমে ‘কথিত জুলাই যোদ্ধা’ বলা হয়। গাজীপুর এলাকায় আন্দোলনের সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করেছেন—এমন দাবিও রয়েছে।

গ্রেপ্তার ও মামলার বিবরণ

২০২৫ সালের ২৪ ডিসেম্বর মধ্যরাতে গাজীপুরের টঙ্গী পূর্ব থানার গোপালপুর টেকপাড়া এলাকায় নিজ বাসা থেকে যৌথবাহিনীর অভিযানে সুরভীকে গ্রেপ্তার করা হয়। মামলাটি দায়ের হয় কালিয়াকৈর থানায়। অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে—
ব্ল্যাকমেইল ও প্রতারণা: জুলাই আন্দোলন-সংক্রান্ত হত্যা মামলায় নাম জড়ানোর ভয় দেখিয়ে গুলশানের এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ধাপে ধাপে প্রায় আড়াই কোটি টাকা আদায়।

মামলা বাণিজ্য ও চাঁদাবাজি: সংঘবদ্ধ চক্রের মূলহোতা হিসেবে ভয়ভীতি দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ।

অন্যান্য অভিযোগ: সরকারি উপদেষ্টা ও সেনাবাহিনী প্রধানকে নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য।

পুলিশের দাবি, ভাইরাল পরিচিতি কাজে লাগিয়ে এসব অপরাধ সংঘটিত হয়েছে এবং মামলায় তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ছিল।

আদালতের হস্তক্ষেপ

গ্রেপ্তারের সময় পুলিশ সুরভীর বয়স ২১ বছর উল্লেখ করে। এফআইআরে বয়স ২১ এবং পুলিশ ফরোয়ার্ডিং প্রতিবেদনে ২০ বছর লেখা হয়। তবে সামাজিক মাধ্যম ও কিছু গণমাধ্যমে ২০১৮ সালের জন্মনিবন্ধন সনদের ভিত্তিতে তার বয়স ১৮ বছরের নিচে—প্রায় ১৭—বলে প্রচার হয়।

সোমবার (৫ জানুয়ারি ২০২৬) গাজীপুরের জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ ফজলুল মাহদি বয়সসংক্রান্ত এই অসঙ্গতিকে তদন্তকারী কর্মকর্তার চরম গাফিলতি ও দায়িত্বজ্ঞানহীনতা বলে মন্তব্য করেন। আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়—বয়সের অসঙ্গতি মামলার সুষ্ঠু বিচারকে বাধাগ্রস্ত করছে।

আসামিপক্ষ অপ্রাপ্তবয়স্ক দাবি উত্থাপন না করলেও মিডিয়া প্রতিবেদনে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।

তদন্তকারী কর্মকর্তাকে তিন কার্যদিবসের মধ্যে সশরীরে হাজির হয়ে এনআইডি বা অনলাইন ভেরিফায়েড জন্মসনদসহ সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়।

একই দিনে সুরভীকে প্রথমে ২ দিনের রিমান্ড দেওয়া হলেও পরে অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ অমিত কুমার দে ৪ সপ্তাহের জামিন মঞ্জুর করেন। আদালতের যুক্তি—জন্মসনদ অনুযায়ী অপ্রাপ্তবয়স্ক হলে শিশু আইন লঙ্ঘন করে রিমান্ড বৈধ নয়। রিমান্ড আদেশের পর আদালত প্রাঙ্গণে বিক্ষোভ দেখা যায়। এ বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল খোঁজ নিয়ে “দ্রুত প্রতিকার” দেওয়ার আশ্বাস দেন।

প্রতিক্রিয়া ও বৃহত্তর প্রেক্ষাপট

সমর্থকদের দাবি, সুরভী রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার; তাকে ফাঁসাতে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে সমালোচকদের মতে, প্রতারণা ও চাঁদাবাজির অভিযোগ গুরুতর এবং ‘জুলাই যোদ্ধা’ পরিচয় ব্যবহার করে অপরাধ সংঘটিত হয়ে থাকলে তার কঠোর বিচার হওয়া উচিত।

জুলাই অভ্যুত্থানের পর বিভিন্ন ‘যোদ্ধা’র বিরুদ্ধে মামলা হ‌য়ে‌ছে। একে কেউ পুরনো শাসনের অবশিষ্ট প্রভাব, কেউ আইনের স্বাভাবিক প্রয়োগ হিসেবে দেখছেন।

তবে সুরভীর ক্ষেত্রে মূল নির্ধারক হয়ে উঠেছে তার প্রকৃত বয়স। তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া চলমান। ন্যায়বিচারের স্বার্থে স্বাধীন, স্বচ্ছ ও দায়িত্বশীল তদন্তের দাবি জোরালো হচ্ছে।