ভেনেজুয়েলা অভিযানের পর কিউবা নিয়ে ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি

কিউবা ঘিরে মার্কিন চাপ: লাতিন আমেরিকায় নতুন সংঘাতের ইঙ্গিত?

টুইট প্রতিবেদন: কিউবায় মার্কিন প্রভাবের ইতিহাস দীর্ঘ, সংঘাতপূর্ণ ও বহুমাত্রিক। ১৯৫৯ সালে ফিদেল কাস্ত্রোর নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র–কিউবা সম্পর্ক অবিশ্বাস ও শত্রুতার আবর্তে আবদ্ধ।

শীতল যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে কিউবাকে সমাজতান্ত্রিক ব্লকের অংশ হিসেবে দেখেছে ওয়াশিংটন, আর সেই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই শুরু হয় দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা ও পরোক্ষ চাপ প্রয়োগের নীতি।

এই বৈরিতার প্রথম বড় প্রকাশ ঘটে ১৯৬১ সালের বে অব পিগস আক্রমণে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত বাহিনী কাস্ত্রো সরকার উৎখাতের ব্যর্থ চেষ্টা চালায়। পরের বছর কিউবান মিসাইল সংকট (১৯৬২) বিশ্বকে পারমাণবিক যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যায়। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পরও যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে মৌলিক পরিবর্তন আসেনি; বরং নিষেধাজ্ঞা আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়।

ভেনেজুয়েলা ও নতুন উত্তেজনা

সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপটে—বিশেষ করে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলায় মার্কিন সামরিক অভিযানের পর—কিউবাকে ঘিরে আলোচনার তীব্রতা বেড়েছে। কিউবার অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরেই ভেনেজুয়েলার তেল ও আর্থিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। ফলে কারাকাসে রাজনৈতিক ও সামরিক পরিবর্তন হাভানার জন্য সরাসরি অস্তিত্বগত চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্য এই উত্তেজনাকে আরও উসকে দিয়েছে।

তিনি দাবি করেছেন, কিউবা “পতনের জন্য প্রস্তুত” এবং ভেনেজুয়েলায় মাদুরো সরকারের পতনের অর্থ কিউবার জন্য অর্থনৈতিক সহায়তার অবসান।

ট্রাম্পের ভাষ্যে, যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে এবং ভবিষ্যতে কিউবার দিকে মনোযোগ বাড়াতে পারে—যা কিউবার রাজনৈতিক মহলে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

ওয়াশিংটনের কৌশল

কিউবা–ভেনেজুয়েলা জোট দুর্বল করা

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও কিউবা–ভেনেজুয়েলা সম্পর্ককে আঞ্চলিক সমাজতান্ত্রিক বলয়ের “মেরুদণ্ড” হিসেবে দেখেন। তাঁর মতে, ভেনেজুয়েলা থেকে তেল সরবরাহ বন্ধ হলে কিউবার অর্থনীতি গুরুতর সংকটে পড়বে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে ভেনেজুয়েলায় সাম্প্রতিক অভিযানকে কেবল একটি দেশকেন্দ্রিক পদক্ষেপ নয়, বরং পুরো লাতিন আমেরিকার ক্ষমতার ভারসাম্য বদলের কৌশল হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে।

কিউবান সরকারের দাবি অনুযায়ী, মার্কিন অভিযানে ৩২ জন কিউবান অফিসার নিহত হয়েছেন—যা কিউবা ও ভেনেজুয়েলার নিরাপত্তা সহযোগিতার গভীরতা প্রকাশ করে। এই দাবি কিউবার অভ্যন্তরে জাতীয়তাবাদী আবেগকে উসকে দিচ্ছে এবং সরকারকে আরও কঠোর অবস্থানে যেতে প্রণোদিত করছে।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও আশঙ্কা

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কিউবা এই অভিযানকে তীব্র ভাষায় নিন্দা করেছে এবং একে মার্কিন এক্সপানশনিজমের নতুন প্রকাশ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। লাতিন আমেরিকার কয়েকটি দেশ আশঙ্কা করছে—এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকলে অঞ্চলটি আবারও সরাসরি ও পরোক্ষ মার্কিন হস্তক্ষেপের যুগে প্রবেশ করতে পারে।

বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, এখনই কিউবার বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক অভিযানের সম্ভাবনা কম। তবে অর্থনৈতিক চাপ, কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা এবং আঞ্চলিক মিত্রদের দুর্বল করার মাধ্যমে কিউবাকে ধীরে ধীরে কোণঠাসা করার কৌশলই ওয়াশিংটনের প্রধান লক্ষ্য হতে পারে।

কিউবা ঘিরে বর্তমান পরিস্থিতি কেবল দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক বিরোধ নয়; এটি লাতিন আমেরিকার ভূরাজনীতির বৃহত্তর পুনর্বিন্যাসের ইঙ্গিত বহন করে। ভেনেজুয়েলায় সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ কিউবার অর্থনীতি ও নিরাপত্তাকে সরাসরি ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।

সামরিক সংঘাতের ঘোষণা না থাকলেও, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপের মাধ্যমে কিউবাকে দুর্বল করার প্রচেষ্টা স্পষ্ট—যা আগামী দিনে গোটা অঞ্চলে অস্থিরতার নতুন অধ্যায় সূচিত করতে পারে।