গুম কমিশনের প্রতিবেদনে শেখ হাসিনা–তারিক সিদ্দিক–আসাদুজ্জামান

গুম কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদন: শেখ হাসিনা, তারিক সিদ্দিক ও আসাদুজ্জামানের সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রমাণ
টুইট প্রতিবেদক: অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে রোববার বিকেলে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় গুম সংক্রান্ত কমিশন অব ইনকোয়ারির চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলপূর্বক গুমের ঘটনাগুলোকে রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং হাই-প্রোফাইল গুমের ক্ষেত্রে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তাঁর প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক এবং তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সময় উপস্থিত ছিলেন কমিশনের সভাপতি অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী, সদস্য অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মো. ফরিদ আহমেদ শিবলী, মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন, নাবিলা ইদ্রিস এবং সাজ্জাদ হোসেন। এছাড়া উপস্থিত ছিলেন উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান এবং প্রধান উপদেষ্টার মুখ্য সচিব সিরাজউদ্দিন মিয়া। প্রধান উপদেষ্টার উপ-প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার এ তথ্য নিশ্চিত করেন।
কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, তদন্তকালে মোট ১,৯১৩টি অভিযোগ জমা পড়ে। যাচাই-বাছাই শেষে এর মধ্যে ১,৫৬৯টি অভিযোগ বলপূর্বক গুমের সংজ্ঞা অনুযায়ী বিবেচিত হয়েছে। এর মধ্যে ২৮৭টি অভিযোগ ‘মিসিং অ্যান্ড ডেড’ (নিখোঁজ ও মৃত) ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত। কমিশন সদস্য নাবিলা ইদ্রিস জানান, এখনো অভিযোগ আসছে এবং প্রকৃত গুমের সংখ্যা ৪ থেকে ৬ হাজারের মধ্যে হতে পারে। অনেক ভুক্তভোগী ভয়ে বা অজ্ঞতায় কমিশনের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি।
কমিশন সদস্যরা বলেন, বলপূর্বক গুমের পেছনে মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল। প্রাপ্ত ডেটা বিশ্লেষণে এটি স্পষ্টভাবে একটি পলিটিক্যালি মোটিভেটেড ক্রাইম হিসেবে প্রতীয়মান হয়েছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী—জীবিত ফেরত আসা ভুক্তভোগীদের মধ্যে ৭৫ শতাংশ জামায়াতে ইসলামী-ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মী এবং ২২ শতাংশ বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের।
এখনো নিখোঁজদের মধ্যে ৬৮ শতাংশ বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী এবং ২২ শতাংশ জামায়াত-শিবিরের।
হাই-প্রোফাইল গুমের উদাহরণ হিসেবে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী, হুম্মাম কাদের চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমেদ, চৌধুরী আলম; জামায়াত নেতা সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল্লাহিল আমান আযমী, ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাসেম; এবং সাবেক রাষ্ট্রদূত মারুফ জামানের নাম।
কমিশন জানায়, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজে অনেক গুমের ঘটনায় সরাসরি নির্দেশদাতা ছিলেন। ভুক্তভোগীদের ভারতে গোপন রেন্ডিশন (আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া হস্তান্তর) করার তথ্য থেকেও স্পষ্ট যে এসব কার্যক্রম সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নির্দেশে সম্পন্ন হয়েছে।
তদন্তে আরও উঠে এসেছে, বরিশালের বলেশ্বর নদীতে সবচেয়ে বেশি হত্যাকাণ্ড ও লাশ গুমের ঘটনা ঘটেছে। শত শত ভুক্তভোগীকে হত্যার পর ওই নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া বুড়িগঙ্গা নদী ও মুন্সিগঞ্জেও লাশ গুমের প্রমাণ মিলেছে।
প্রতিবেদন গ্রহণ করে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস কমিশন সদস্যদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও দৃঢ় মনোবলের জন্য ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, “এটি একটি ঐতিহাসিক কাজ। জাতির পক্ষ থেকে আমি এই কমিশনের সকলকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আপনারা যে ঘটনাগুলো বর্ণনা করলেন, বাংলায় ‘পৈশাচিক’ শব্দটি আছে—এক কথায় বললে এই ঘটনাগুলোকে সেই শব্দ দিয়েই বর্ণনা করা যায়।”
তিনি আরও বলেন, “বাংলাদেশের সব প্রতিষ্ঠানকে দুমড়ে-মুচড়ে দিয়ে গণতন্ত্রের লেবাস পরে মানুষের ওপর কী পৈশাচিক আচরণ করা যেতে পারে—তার ডকুমেন্টেশন এই প্রতিবেদন। মানুষ কত নিচে নামতে পারে, কতটা নৃশংস হতে পারে—এটিই তার প্রমাণ। এই নৃশংসতা থেকে জাতি হিসেবে আমাদের চিরতরে বের হয়ে আসতে হবে।”
প্রধান উপদেষ্টা প্রতিবেদনটি সহজ ভাষায় জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়ার আহ্বান জানান এবং কমিশনকে প্রয়োজনীয় সুপারিশ ও ভবিষ্যৎ করণীয় পেশ করার নির্দেশ দেন। তিনি আয়নাঘরসহ বিচারবহির্ভূত হত্যা ও লাশ গুমের স্থানগুলো ম্যাপিং করার নির্দেশনাও প্রদান করেন।
কমিশন সদস্যরা প্রধান উপদেষ্টাকে বিশেষ ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, তাঁর দৃঢ় অবস্থান ছাড়া এই কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হতো না। তারা জাতীয় মানবাধিকার কমিশন পুনর্গঠন করে কার্যক্রম জোরদার করার আহ্বান জানান এবং ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি অনুরোধ করেন।






