তেলের দখল, রক্তের রাজনীতি: ভেনেজুয়েলা সংকট চরমে

ভেনেজুয়েলা সংকট: মাদুরোর গ্রেপ্তার, মার্কিন অভিযান ও বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়ায় তোলপাড়।
বিশেষ প্রতিবেদক: ভেনেজুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী গ্রেপ্তার করার পর বিশ্ব রাজনীতিতে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে।
শনিবার (৩ জানুয়ারি) রাতে ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে বড় পরিসরের বিমান হামলার মধ্য দিয়ে এই অভিযান চালানো হয়। অভিযানের পর তাদের নিউইয়র্কে নিয়ে আসা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন—যুক্তরাষ্ট্র অস্থায়ীভাবে ভেনেজুয়েলা পরিচালনা করবে এবং দেশটির তেল সম্পদ নিয়ন্ত্রণে নেবে। হামলায় অন্তত ৪০ জন নিহত হয়েছে, যাদের মধ্যে সাধারণ নাগরিকও রয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের অভিযান
শনিবার গভীর রাতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী কারাকাসে বিমান হামলা চালায়, যা ভেনেজুয়েলার সরকার কাঠামো কার্যত উল্টে দেয়। অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে আটক করা। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন,
“যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলায় বড় আক্রমণ চালিয়েছে এবং মাদুরোকে গ্রেপ্তার করেছে। নিরাপদ রূপান্তর না হওয়া পর্যন্ত আমরা দেশটি পরিচালনা করব।”
ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি অনুযায়ী, অভিযানে কোনো মার্কিন সেনা হতাহত হয়নি—যা তারা ‘শক্তি ও নেতৃত্বের উদাহরণ’ হিসেবে তুলে ধরেছে। অভিযানের পর মাদুরোকে প্রথমে ইউএসএস আইও জিমা জাহাজে নেওয়া হয়। ট্রাম্প শেয়ার করা একটি ছবিতে দেখা যায়, মাদুরো হেলমেট ও লাইফ জ্যাকেট পরা অবস্থায় রয়েছেন।
হামলায় কারাকাসের আশপাশে একাধিক বিস্ফোরণ ঘটে। এতে আবাসিক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং একটি পরিবারের সদস্যরা নিহত হন—যাদের মধ্যে একজন ৮০ বছর বয়সী বৃদ্ধাও রয়েছেন।
আটক প্রক্রিয়া
মাদুরো ও সিলিয়া ফ্লোরেসকে নিউইয়র্কের স্টুয়ার্ট এয়ার ন্যাশনাল গার্ড বেসে নামানো হয়। সেখানে প্রাথমিক প্রক্রিয়া সম্পন্নের পর একটি ভিডিওতে দেখা যায়—রাতের অন্ধকারে বিমান থেকে নামার সময় মাদুরোর হাতে হ্যান্ডকাফ, ডিইএ অফিসারদের কঠোর পাহারায়। তিনি ইংরেজিতে “গুড নাইট” ও “হ্যাপি নিউ ইয়ার” বলার চেষ্টা করেন।
পরবর্তীতে হেলিকপ্টারে করে তাদেরকে ম্যানহাটানের ডিইএ হেডকোয়ার্টারে নেওয়া হয় এবং সেখান থেকে ব্রুকলিনের মেট্রোপলিটান ডিটেনশন সেন্টার (এমডিসি)-তে স্থানান্তর করা হয়। এমডিসি একটি কুখ্যাত কারাগার—যেখানে খারাপ অবস্থা, স্টাফ সংকট ও সহিংসতার অভিযোগ রয়েছে।
আরেকটি ছবিতে মাদুরোকে ডিইএ এজেন্টদের সঙ্গে দেখা যায়—তিনি সেখানে ডাবল থাম্বস-আপ দিচ্ছেন।
অভিযোগ ও আইনি প্রক্রিয়া
মাদুরোর বিরুদ্ধে নার্কো-টেররিজম, কোকেন আমদানির ষড়যন্ত্র, অবৈধ অস্ত্র রাখাসহ একাধিক গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলাটি নিউইয়র্কের সাউদার্ন ডিস্ট্রিক্ট কোর্টে চলবে। সোমবার বা মঙ্গলবার তাকে আদালতে হাজির করা হতে পারে; সেখানে তিনি নির্দোষ দাবি করতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে ফুগিটিভ হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় তার জামিন পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। বিচার ৭০ দিনের মধ্যে শুরু হতে পারে, আবার বিলম্বিত হয়ে ১–২ বছরও লাগতে পারে। বিশ্লেষকরা এ মামলাকে পানামার সাবেক শাসক ম্যানুয়েল নরিয়েগা মামলার সঙ্গে তুলনা করছেন—যেখানে আন্তর্জাতিক আইনের যুক্তি আদালতে টেকেনি।
আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ প্রতিক্রিয়া
ভেনেজুয়েলান প্রতিক্রিয়া
মিয়ামি ও নিউইয়র্কসহ বিভিন্ন শহরে ভেনেজুয়েলান প্রবাসীরা রাস্তায় নেমে উদযাপন করছেন। একটি ছবিতে দেখা যায়—এক নারী ভেনেজুয়েলার পতাকা হাতে আবেগাপ্লুত হয়ে কাঁদছেন।
কারাকাসে প্রতিক্রিয়া মিশ্র—কেউ শান্তি চায়, কেউ সম্ভাব্য যুদ্ধ নিয়ে আতঙ্কিত। ভেনেজুয়েলার সুপ্রিম কোর্ট ডেলসি রড্রিগেজকে অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট হিসেবে ঘোষণা করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ প্রতিক্রিয়া
ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের অনুমতি ছাড়া সামরিক অভিযান চালানোর অভিযোগে ট্রাম্পের তীব্র সমালোচনা করেছেন। সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স এটিকে “র্যাঙ্ক ইম্পিরিয়ালিজম” বলে অভিহিত করেন।
রিপাবলিকানদের মধ্যেও মতভেদ দেখা গেছে—মার্জোরি টেলর গ্রিন এটিকে “আমেরিকা ফার্স্ট” নীতির লঙ্ঘন বলে মন্তব্য করেন। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ হয়েছে—স্লোগান উঠেছে, “ভেনেজুয়েলায় যুদ্ধ নয়।”
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লাউডিয়া শেইনবাউম অন্য দেশের সার্বভৌমত্ব ও অধিকারের প্রতি সম্মান দেখানোর আহ্বান জানিয়ে পরোক্ষ সমালোচনা করেছেন।
রুশ দার্শনিক আলেক্সান্ডার দুগিন বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রে দুর্নীতিবাজদের গ্রেপ্তার করা কঠিন, কিন্তু একটি সার্বভৌম দেশের প্রেসিডেন্টকে গ্রেপ্তার করা সহজ।”
জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ বেন সাউল এ অভিযানকে অবৈধ বলে নিন্দা জানিয়ে ট্রাম্পের অভিশংসনের দাবি তুলেছেন।
ভেনেজুয়েলার বর্তমান পরিস্থিতি ও ভবিষ্যৎ
দেশজুড়ে বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও খাদ্যের দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে। প্রো-সরকারি প্যারামিলিটারি গোষ্ঠীগুলো রাস্তায় অস্ত্র নিয়ে টহল দিচ্ছে। ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন—যুক্তরাষ্ট্র তেল শিল্পে বিনিয়োগ করবে এবং সেখানে চীনের প্রভাব প্রতিস্থাপন করবে।
বিরোধী নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদো দাবি করেছেন—এডমুন্ডো গনজালেজকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। বিশ্লেষকদের মতে, এই সংকটকে অনেকেই “তেলের জন্য রক্ত” হিসেবে দেখছেন। সামনে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও নির্বাচন হতে পারে—তবে পরিস্থিতি এখনো গভীর অনিশ্চয়তায়।







