বেনিনে সামরিক অভ্যুত্থানের চেষ্টা: সরকারের দাবি, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে

বেনিনে সামরিক অভ্যুত্থানের চেষ্টা: প্রেসিডেন্ট ট্যালনকে ক্ষমতাচ্যুত ঘোষণা, সরকার বলছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে।
বিশ্ব ডেস্ক: পশ্চিম আফ্রিকার দেশ বেনিনে রবিবার (৭ ডিসেম্বর) সকালে আকস্মিকভাবে সামরিক অভ্যুত্থানের চেষ্টা চালানো হয়েছে। ভোরে রাজধানী কোটোনুর ক্যাম্প গুয়েজো এলাকায় প্রেসিডেন্টের বাসভবনের কাছে গুলির শব্দে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ে।
ফরাসি দূতাবাস ঘটনাটি নিশ্চিত করে তাদের নাগরিকদের ঘরে থাকার নির্দেশ দেয়। পরে সকাল ৭টার দিকে ৮–১০ জন সশস্ত্র সৈন্য রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ORTB দখল করে প্রেসিডেন্ট প্যাট্রিস ট্যালনকে ক্ষমতাচ্যুত ঘোষণা করে। একই সঙ্গে তারা ‘পুনর্গঠনের জন্য সামরিক কমিটি’ (CMR) গঠনের কথা জানায় এবং লেফটেন্যান্ট কর্নেল পাস্কাল টিগ্রিকে নেতা হিসেবে ঘোষণা করে। অভ্যুত্থানকারীরা সংবিধান স্থগিত, সরকার ভেঙে দেওয়া এবং স্থল–আকাশ–সমুদ্র সব সীমান্ত বন্ধ করে দেওয়ার কথা জানায়। তাদের দাবি, “বেনিন নতুন যুগে প্রবেশ করবে, যেখানে ন্যায়, ভাইচারা ও শ্রম হবে প্রধান মূল্যবোধ।”
ঘোষণা প্রচারের কিছুক্ষণের মধ্যেই রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের সম্প্রচার বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু এরপরই সরকারের পক্ষ থেকে পাল্টা বিবৃতি আসে। বেনিনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী Olushegun Adjadi Bakari রয়টার্সকে বলেন, এটি ছিল “একটি ছোট গ্রুপের বিদ্রোহী প্রচেষ্টা”, এবং সরকার ইতোমধ্যেই নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করছে। সামরিক সূত্রও জানায়, কুপকারীরা প্রেসিডেন্টের বাসভবন বা প্রশাসনিক কোনো কেন্দ্রীয় স্থাপনা দখল করতে সক্ষম হয়নি। প্রেসিডেন্ট ট্যালন নিরাপদ আছেন এবং সরকারসমর্থক বাহিনী পরিস্থিতি দখলে রেখেছে বলে দাবি করা হয়।
এদিকে কোটোনুর বিভিন্ন এলাকায় গুলির শব্দ শোনা গেছে বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম X-এ ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে বিভক্ত প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে—কিছু নাগরিক কুপকে সমর্থন জানিয়ে বলছেন, “গণতন্ত্র কাজ করছে না, পরিবর্তন দরকার”; অন্যদিকে অনেকে গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বিশেষ করে প্রতিবেশী নাইজেরিয়ার নাগরিকেরা লিখেছেন, বেনিন অস্থিতিশীল হলে সীমান্ত নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়বে।
বেনিনের রাজনৈতিক ইতিহাস দীর্ঘদিন ধরেই অস্থিরতায় ভরা। ১৯৬০ সালে ফ্রান্স থেকে স্বাধীনতার পর ১৯৬০–১৯৯০ পর্যন্ত দেশটিতে বারবার সামরিক অভ্যুত্থান হয়েছে। ১৯৭২ সালে ম্যাথিউ কেরেকো ক্ষমতা দখল করে মার্কসবাদী-লেনিনবাদী শাসন চালান। তবে ১৯৯১ সালের পর থেকে দেশটি আফ্রিকার স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত ছিল। বর্তমান প্রেসিডেন্ট প্যাট্রিস ট্যালন—যাকে “Cotton King” বলা হয়—২০১৬ সালে ক্ষমতায় আসেন এবং ২০১৯ সালে পুনর্নির্বাচিত হন। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়লেও বিরোধীরা দীর্ঘদিন ধরে তাঁর বিরুদ্ধে কর্তৃত্ববাদী শাসনের অভিযোগ করে আসছে। সম্প্রতি ২০২৫ সালের নভেম্বরে তিনি প্রেসিডেন্টের মেয়াদ ৫ থেকে ৭ বছর বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিলে দেশজুড়ে অসন্তোষ দেখা দেয়। যদিও ট্যালন ঘোষণা করেছিলেন ২০২৬ সালের এপ্রিলে তিনি পদত্যাগ করবেন এবং উত্তরসূরির নামও ঠিক করেছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে বেনিনের উত্তরাঞ্চলে জিহাদি হামলা বৃদ্ধি, রাজনৈতিক চাপ, আসন্ন নির্বাচন এবং সেনাবাহিনীর একটি অংশের অসন্তোষ—সব মিলিয়েই এই অভ্যুত্থানচেষ্টার পটভূমি তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। আন্তর্জাতিক পর্যায়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। ফ্রান্স ইতোমধ্যে সতর্কতা জারি করেছে। BBC, CNN, Al Jazeera, France 24 একাধিক লাইভ আপডেট প্রচার করছে। যদিও ECOWAS এবং আফ্রিকান ইউনিয়ন এখনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়নি, তবে পরিস্থিতি বিবেচনায় তাদের কূটনৈতিক হস্তক্ষেপ আসন্ন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পশ্চিম আফ্রিকা গত কয়েক বছরে ধারাবাহিক সামরিক কুপের মুখোমুখি হয়েছে। শুধু ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে নাইজার, বুর্কিনা ফাসো, মালি, গিনি-বিসাউসহ একাধিক দেশে সরকার উৎখাত হয়েছে। সাম্প্রতিক কুপগুলোর সঙ্গে মিল রেখে বিশেষজ্ঞরা বলছেন—জিহাদি হুমকি, দুর্নীতি ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা এই অঞ্চলের সামরিক অসন্তোষ বাড়িয়ে তুলছে।
সর্বশেষ পরিস্থিতিতে দেখা যাচ্ছে—বেনিনে অভ্যুত্থানকারীদের প্রচেষ্টা এখনো পুরোপুরি সফল হয়নি। সরকার ও সেনাবাহিনীর আনুগত্যশীল অংশ পরিস্থিতি দখলে রাখার দাবি করছে। তবে ঘটনাবলি দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে এবং যেকোনো সময় নতুন ঘোষণা আসতে পারে।
বর্তমানে পরিস্থিতি স্থিতিশীল হয়ে আসছে, কিন্তু অস্থিরতা অব্যাহত। সরকারের দাবি অনুসারে, অভ্যুত্থান ব্যর্থ এবং প্রেসিডেন্ট নিরাপদ। তবে, এটি পশ্চিম আফ্রিকায় ক্যু-র ঢেউকে (২০২০ থেকে ৯টি) আরও উস্কে দিতে পারে।









