বাংলাদেশের মানচিত্র থেকে হারাতে বসেছে পদ্মা পাড়ের কয়েকটি গ্রাম
নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভারত সীমান্তবর্তী চারটি ইউনিয়নে প্রতিদিনই ভয়াবহ আকারে বিস্তার লাভ করছে পদ্মার ভাঙন। অপ্রতিরোধ্য স্রোতে একের পর এক বিলীন হয়ে যাচ্ছে শত শত বসতবাড়ি, হাজার হাজার বিঘা আবাদি জমি, মসজিদ-মাদ্রাসা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমনকি সীমান্তরক্ষী বিজিবি ক্যাম্পও। ফলে বাংলাদেশের মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাওয়ার শঙ্কায় পড়েছে সীমান্তবর্তী কয়েকটি গ্রাম।
গ্রাম হারিয়ে বাস্তুচ্যুত মানুষের হাহাকার
গত দুই বছরে রাজশাহীর গোদাগাড়ীর চর আষাড়িয়াদহ ও দেওপাড়া এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জের চর আলাতুলি ও চর দেবীনগর ইউনিয়নের অন্তত ১০টি গ্রাম নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। হারিয়েছে শত শত পরিবার, কয়েক হাজার একর জমি ও সামাজিক অবকাঠামো।
চর আলাতুলি ইউনিয়নের কৃষক মো. ছিদ্দিক বলেন, “একসময় আমাদের গ্রামে এক হাজারের বেশি বাড়ি ছিল, এখন অর্ধেকও নেই। পদ্মা সব নিয়ে গেছে। যারা আছি তারাও জানি না, কালকে আছি নাকি থাকব।”
চাঁপাইনবাবগঞ্জের পোলাডাঙ্গা গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, গ্রামের একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্রিজ এখন স্রোতের ধার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে। পদ্মার করাল গ্রাসে এটি ভেঙে পড়লে গ্রামবাসী সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে।
সীমান্ত নিরাপত্তাও হুমকির মুখে
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের হিসাবে, গত এক দশকে পদ্মার ভাঙনে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তবর্তী এলাকায় অন্তত ১০ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় স্থাপনা হারিয়ে গেছে। বর্তমানে অন্তত ১ হাজার পরিবার সরাসরি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
সাবেক ইউপি সদস্য মারফত আলী বলেন, “পদ্মার ভাঙনে গ্রামগুলো প্রতিনিয়ত সঙ্কুচিত হচ্ছে। এখনো পোলাডাঙ্গা ও হরমা গ্রাম মানচিত্র থেকে হারানোর পথে। এমনকি সীমান্তে থাকা বিজিবি ক্যাম্পও হুমকির মুখে। যদি ক্যাম্প নদীগর্ভে চলে যায়, তবে সীমান্ত কার্যত বিএসএফের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে।”
স্থানীয় সেন্টু আলী জানান, “আমরা শুধু ঘরবাড়িই হারাচ্ছি না, ভাঙন ঠেকানো না গেলে সীমান্তও হুমকির মুখে পড়বে।”
স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের দাবি
চরাঞ্চলের গৃহবধূ রেহানা খাতুন বলেন, “প্রতিবার ভাঙনের সময় রাতারাতি ঘরবাড়ি সরাতে হয়। শিশু-বৃদ্ধ ও গৃহপালিত প্রাণী নিয়ে নিরাপদে থাকার উপায় নেই। মনে হয়, নদীর সঙ্গে আমরাও ভেসে যাব।”
কৃষক আমিন আলী অভিযোগ করেন, পানি উন্নয়ন বোর্ড জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা করলেও তা কার্যকর হয়নি। তার দাবি, “যে ব্যাগে ২৫০ কেজি বালু থাকার কথা, সেখানে ১০০ কেজিও ভরা হয়নি।”
পাউবোর রাজশাহী আঞ্চলিক কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুর রহমান অঙ্কুর বলেন, ‘‘কয়েকটি এলাকায় জিও ব্যাগ ফেলা হয়েছে। সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে, তবে স্রোতের তীব্রতার কারণে টেকসই করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে।’’
গোদাগাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফয়সাল আহমেদ জানান, ভাঙনকবলিত এলাকায় পরিদর্শন করা হয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্তদের শুকনো খাবার সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
চরাঞ্চলের মানুষ বলছেন, সাময়িক প্রতিরক্ষা নয়- স্থায়ী ও টেকসই বাঁধ নির্মাণই এখন একমাত্র সমাধান। তা না হলে অচিরেই সীমান্তবর্তী গ্রামগুলো পুরোপুরি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাবে।