ড. ইউনূসের সঙ্গে বৈঠকে কী বলেছেন নরেন্দ্র মোদী

পদ্মাটাইমস ডেস্ক: বিগত কয়েক মাসের রাজনৈতিক টানাপোড়েন, সীমান্ত পরিস্থিতি এবং সংখ্যালঘু সুরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোর মধ্যেই বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বৈঠকে বসেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।

শুক্রবার ব্যাংককে বিমসটেক সম্মেলনের ফাঁকে অনুষ্ঠিত এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠক দুই দেশের কূটনৈতিক মহলে বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।

বৈঠকে মোদী বাংলাদেশের সঙ্গে বাস্তবভিত্তিক, ইতিবাচক এবং জনগণকেন্দ্রিক সম্পর্ক গড়ে তোলার উপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, ভারত বরাবরই চায় বাংলাদেশ একটি শান্তিপূর্ণ, স্থিতিশীল, গণতান্ত্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে উঠুক। এই বার্তাটি তিনি সরাসরি অধ্যাপক ইউনূসের কাছে তুলে ধরেন।

বৈঠকের পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স (সাবেক টুইটার)-এ লেখেন,

“বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সাথে সাক্ষাৎ করেছি। ভারত বাংলাদেশের সাথে একটি গঠনমূলক ও জনগণকেন্দ্রিক সম্পর্কের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বাংলাদেশে শান্তি, স্থিতিশীলতা, অন্তর্ভুক্তি ও গণতন্ত্রের প্রতি ভারতের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছি। অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রম রোধ ও সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছি।”

বৈঠকে মোদী বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, বিশেষ করে হিন্দুদের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, সম্প্রদায়ভিত্তিক সহিংসতা, নিপীড়ন কিংবা বৈষম্যের ঘটনা ভারতের জন্য উদ্বেগজনক। মোদী আশাবাদ ব্যক্ত করেন, বাংলাদেশের সরকার এসব ঘটনায় কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে এবং দোষীদের বিচারের আওতায় আনবে।

ভারতের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা পিটিআই জানিয়েছে, মোদী তার বক্তব্যে স্পষ্টভাবে সংখ্যালঘু সুরক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে তুলে ধরেন এবং বাংলাদেশ সরকারকে এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।

দুই নেতার আলোচনায় সীমান্ত পরিস্থিতিও গুরুত্ব পায়। মোদী সীমান্তে অবৈধ অনুপ্রবেশ বন্ধে কড়া পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর জোর দেন, অন্যদিকে বাংলাদেশ সীমান্তে সাধারণ নাগরিকদের হতাহতের ঘটনা বন্ধের আহ্বান জানায়।

ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি বৈঠক শেষে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে জানান,

“সীমান্তে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে আইনের কঠোর প্রয়োগ জরুরি। ভারত চায়, সীমান্ত দিয়ে অবৈধ যাতায়াত বন্ধ হোক এবং উভয় দেশের মধ্যে এই বিষয়ে পারস্পরিক সহযোগিতা আরও দৃঢ় হোক।”

বৈঠকে অধ্যাপক ইউনূস সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের প্রসঙ্গ তোলেন। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি বলেন, “এটি আলোচনার বিষয় ছিল না।”

তিনি আরও জানান, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধ পেয়েছে, তবে এই বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বিবৃতি এখনো দেওয়া হয়নি।

গত বছরের ৫ আগস্ট বাংলাদেশে একটি গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর পরিস্থিতির নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে। শেখ হাসিনা ভারতে চলে গেলে, তার অনুপস্থিতিতে অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। এরপর থেকেই ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক কিছুটা অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, শেখ হাসিনার ভারতে উপস্থিতি এবং তাঁর প্রত্যর্পণ ইস্যুই ছিল এই টানাপোড়েনের মূল কারণ।

এরপর দুই দেশের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে কোনো বৈঠক না হওয়ায় সম্পর্কের ক্ষেত্রে দূরত্ব বেড়েছিল। এমন অবস্থায় বিমসটেক সম্মেলনের ফাঁকে এই বৈঠককে কূটনৈতিক অগ্রগতির গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বৈঠকের শেষ পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী মোদী বিমসটেকের পরবর্তী সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ায় বাংলাদেশকে অভিনন্দন জানান। তিনি বলেন, “বাংলাদেশের নেতৃত্বে এই আঞ্চলিক জোট আরও শক্তিশালী হবে এবং সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধি পাবে।”

অধ্যাপক ইউনূস ও প্রধানমন্ত্রী মোদীর এই বৈঠক শুধু দুই দেশের মধ্যকার বিদ্যমান উত্তেজনার বরফ গলাতে নয়, বরং ভবিষ্যতে স্থিতিশীল, সহযোগিতামূলক ও জনগণমুখী দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক গড়ার এক নতুন দিক উন্মোচন করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই আলোচনা দুই দেশের মধ্যে আলোচনার দ্বার আরও প্রসারিত করবে এবং কূটনৈতিক সমাধানের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবে।