রাজশাহীতে কৃষি জমি দখল করে পুকুর খননের হিড়িক, কারা দিচ্ছে মদত?
রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় কৃষি জমি দখল করে চলছে পুকুর খননের উৎসব
টুইট ডেস্ক : রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে অবাধে চলছে পুকুর খননের মহোৎসব। রাতের আঁধারে দখল করা হচ্ছে তিন ফসলি কৃষি জমি।
অভিযোগ উঠেছে, স্থানীয় বিএনপি নেতাদের ছত্রছায়ায় একদল প্রভাবশালী ব্যক্তি এই অনিয়মে জড়িত। এতে বিল-খালসহ আবাদি জমির পরিবেশগত ভারসাম্য ও কৃষকদের জীবিকা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।
সরেজমিনে যা দেখা গেছে, বাগমারার ১৬টি ইউনিয়নের প্রায় প্রতিটিতেই চলছে পুকুর খনন। বিশেষ করে আউসপাড়া, শুভডাঙ্গা, গনিপুর, গোয়ালকান্দি, ঝিকরা ও বিহানালী ইউনিয়নের অন্তত অর্ধশতাধিক স্পটে রাতের আঁধারে চলছে এই খনন কাজ। নিমাই বিল, দুবিলা বিল, চান্দেরআড়া গ্রাম ও আনুলিয়া বিলে প্রকাশ্যে ভেকু মেশিন নামিয়ে পুকুর খননের কাজ চালানো হচ্ছে।
স্থানীয় কৃষকরা জানান, রাতের বেলায় হঠাৎ ভেকু নামিয়ে জমি দখল করে নেয় প্রভাবশালীরা। এতে জমির মালিকরা বাধা দিতে গেলে তাদের হুমকি-ধমকি দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, এসব পুকুর খননে স্থানীয় বিএনপি নেতাদের প্রত্যক্ষ মদদ রয়েছে।
ক্ষমতার দাপটে চলছে দখল উৎসব
শুভডাঙ্গা ইউনিয়নের নিমাই বিল এলাকার ৭০ জন কৃষকের প্রায় শত বিঘা জমি দখল করে পুকুর খননের অভিযোগ উঠেছে বিএনপি নেতা জাহাঙ্গীর হোসেন, খুরশেদ আলম, আব্দুল হাকিম ও সাহেব আলীর বিরুদ্ধে।
একইভাবে গনিপুর ইউনিয়নের হাসনিপুর মৌজার চান্দেরআড়া গ্রামে রুস্তম আলী নামে এক ব্যক্তি প্রায় ১২ বিঘা জমি দখল করে পুকুর খনন শুরু করেছেন।
এ বিষয়ে ভুক্তভোগী জমির মালিক রফিকুল ইসলাম বলেন, “আমাদের জমি রাতের বেলায় দখল করে নিয়েছে। বিএনপির নেতারা স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশকে ম্যানেজ করে দেদারছে পুকুর খনন করছে। আমরা অভিযোগ দিয়েও কোনো প্রতিকার পাচ্ছি না।”
রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের অভিযোগ
স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, বিগত ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা যেভাবে বাগমারার বিভিন্ন বিলে পুকুর খনন করেছিল, এখন বিএনপি নেতারা সেই একই কায়দায় দখল উৎসবে মেতেছেন।
তাদের ভাষায়, এক সময় বাগমারার এমপি কালাম-কে ‘ভেকু কালাম’ বলে কটাক্ষ করতো বিএনপি নেতারা, আজ তারাই ভেকুর আওয়াজে বিল-খাল দখল করে চলছে।
পরিবেশের ওপর প্রভাব
অব্যাহত পুকুর খননের ফলে বাগমারার পরিবেশের ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়ছে। বাগমারা পরিবেশ সংরক্ষণ কমিটির সভাপতি আব্দুল কুদ্দুস বলেন, “এভাবে কৃষি জমি ধ্বংস হলে এলাকায় খাদ্য সংকট তৈরি হবে। জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি হবে। এই অবস্থা চলতে থাকলে ভবিষ্যতে বাগমারার কৃষির অস্তিত্বই বিলীন হয়ে যাবে।”
প্রশাসনের অবস্থান
বাগমারার উপজেলা নির্বাহী অফিসার মাহবুবুল ইসলাম জানান, “আমরা পুকুর খনন বন্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি। তবে রাতের আঁধারে এই কাজ চালানোর কারণে অনেক সময় তা ঠেকানো সম্ভব হচ্ছে না। দখলদারদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
বিএনপির অবস্থান
এ বিষয়ে বাগমারা উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব অধ্যাপক কামাল হোসেন বলেন, “যদি কোনো নেতা-কর্মী পুকুর খনন বা জমি দখলে জড়িত থাকে, তাহলে দলীয়ভাবে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এই বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন।”
সচেতন মহলের মন্তব্য
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ব্যারিস্টার সালেকুজ্জামান সাগর বলেন, “দুর্বৃত্তায়ন ও চাঁদাবাজির রাজনীতি বন্ধ না হলে এই ধরনের অপরাধ বন্ধ করা সম্ভব নয়। রাজনৈতিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। প্রশাসনকে আরও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।”
বাগমারার সাধারণ মানুষ প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতাদের দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তারা জমি রক্ষায় প্রশাসনের সহায়তা চেয়েছেন।
সংবাদটি প্রকাশের সময় পর্যন্ত পুকুর খনন বন্ধের কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।